

সিএইচটি টাইমস নিউজ ডেস্কঃ-# ঝুম চাষের জন্য জ্বালিয়ে পাহাড় ন্যাড়া করা হচ্ছে
# মাটি কেটে অপরিকল্পিত আবাসন তৈরি হচ্ছে
# দলীয় নেতাকর্মীরা পাহাড় কাটছেঃ-পবা
# পাহাড় কাটা বন্ধে সরকার নিরব
কোনো প্রকার নিয়মের তোয়াক্কা না করে পাহাড় জ্বালিয়ে ন্যাড়া করে জুম চাষ করছে পাহাড়ীরা। একশ্রেণীর সুবিধাভোগীরা পাহাড়ের মাটি ও গাছপালা কেটে নিয়ে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করছে।আর সরকার তাদের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছে না।দিনের পর দিন পাহাড়ের উপর এ ধরনের পরিবেশ বিরোধী অত্যাচারের কারণে আজ পাহাড় ধসে পড়ছে।নিহত হচ্ছে নারী,পুরুষ, শিশু।গত কয়েক দিনে পাহাড় ধসে তিন পাবর্ত্য জেলায় দেড়শতাধিক মানুষ নিহত হয়েছে।এখনো অনেককেই উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।তিন পাবর্ত্য এলাকায় এক অমানবিক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।পাহাড় ধসের কারণ নিয়ে গবেষণাকারী ও পার্বত্য এলাকার বাসিন্দারা বলছেন,পাহাড়ের গায়ের ঘাস পাহাড়কে বাঁচিয়ে রাখে।সে সব ঘাস ছেটে ফেলে মানুষের বসবাসের উপযোগী করতে গিয়েই এধরনের ঘটনার সূচনা হয়েছে।বৃষ্টিপাত হলেই পাহাড় ধস হতো না,যদি না মানবসৃষ্ট কারণগুলো প্রভাবক না হতো।গবেষণায় বলা হচ্ছে,পাহাড়ের গাছপালা কেটে ফেলা,মাটি কেটে ফেলা,প্রাকৃতিক খাল বা ঝরণার গতি পরিবর্তন এবং পাহাড়ের ঢালুতে অতিরিক্ত ভার দেয়া ধসের অন্যতম কারণ।এর আগে পাহাড় ধসের সবচেয়ে মর্মান্তিক ঘটনাটি ঘটে ২০০৭ সালের ১১ জুন।সেদিনের টানা বর্ষণে বন্দরনগরী চট্টগ্রামের হাটহাজারী,পাহাড়তলী, বায়েজীদ বোস্তামি,খুলশী এলাকায় পাহাড় ধসে ১২৭ জন নিহত এবং দুই শতাধিক মানুষ আহত হন।এরপর সরকার একটি টেকনিক্যাল কমিটি গঠন করে ধসের কারণ ও করণীয় নির্ধারণের নির্দেশ দেয়।সেই ১১ সদস্যের কমিটির গবেষণার দায়িত্ব পাওয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘পাহাড় ধসের কারণ প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট।বৃষ্টিপাত হলেই পাহাড় ধস হতো না,যদি না মানবসৃষ্ট কারণ তৈরি করা না হতো।পাহাড়ে যে ঘাস ও গাছ থাকে,সেগুলো কেটে ও আগুনে পুড়িয়ে ন্যাড়া করে দেয়ার কারণে শুষ্ক মৌসুমে ভেতরে ভেতরে এতটাই ফাটল তৈরি হয় যে,ভারি বৃষ্টিপাত হলেই ফাটলের ভেতর পানি ঢুকে মাটির স্তর নড়ে যায় এবং পাহাড় ধসে পড়ে।’ তিনি আরও বলেন, ‘ধস যখন জনপদে নামে তখন আমাদের চোখে পড়ে।কিন্তু গবেষণা করতে গিয়ে দেখেছি,প্রচুর পাহাড় ধসে পড়ছে প্রতিবছর।পাহাড়গুলো যখন লিজ দেয়া হয়,তখন সেটা থাকে বন আচ্ছাদিত। কিন্তু লিজ নেন যিনি তিনি তার বাণিজ্যিক লক্ষ্য পূরণে প্রথমেই সেই বন উজাড় করেন।আর জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে পাহাড় কেটে কেটে বসতি স্থাপন করা হয় অপরিকল্পিতভাবে।’ এর ওপরে ন্যাড়া আর নিচে খোঁড়া পাহাড়গুলোই ধসে পড়ছে উল্লেখ করে পাহাড়ে বসবাসকারীরা বলছেন,বিগত কয়েক যুগ ধরে পাহাড় কাটার পাশাপাশি প্রকৃতির যতœ-আদরে পাহাড়ের গায়ে বেড়ে ওঠা নানা প্রজাতির বৃক্ষরাজিকে নির্বিচারে ধ্বংস করা হয়েছে।পাহাড় কেটে সমতল ভূমি তৈরি করে সেখানে মুনাফালোভী সিন্ডিকেট,তাদের ফায়দা হাসিলের চেষ্টায় ব্যস্ত।খাগড়াছড়ির আইনজীবী সমারি চাকমা বলেন,‘ছোটবেলায় বনজ বৃক্ষ ঘেরা পাহাড় দেখেছি। এখন সব কৃত্রিম বাগান।বড় প্রাকৃতিক বাগান নেই।পাহাড়ে যেসব গাছ লাগানো হয়েছে,তা মাটি ধরে রাখার উপযোগী নয়।আর যেখানে সেখানে পাহাড় কেটে রাস্তা বানানো,বসতি স্থাপনের নজির গত বিশ-পঁচিশ বছরে ঘটেছে ব্যাপকহারে।ওপরে ন্যাড়া আর নিচে কেটে খোঁড়া বানানো পাহাড়গুলোই ভারি বর্ষণে ধসে পড়ছে।আগে দেখেছি,বসতি স্থাপনের উপযোগী কিনা তা দেখেশুনে জায়গা নির্ধারণ করতেন পাহিড়িরা।এই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে বসতি স্থাপনের নজির এখন দেখা যায় না।’
জিও সায়েন্স অস্ট্রেলিয়ার এক গবেষণায় বলা হয়েছে, পাহাড় ধসের পেছনে প্রাকৃতিক কারণ এবং মানুষের বিভিন্ন কর্মকা-মূল প্রভাবক হিসেবে কাজ করে।প্রাকৃতিক কারণ হলো পাহাড়ের ঢাল যদি এমন হয় যে ঢালের কোনো অংশে বেশি গর্ত থাকে।তখন অতিবৃষ্টিতে ভূমি ধস হতে পারে।এ ছাড়া ভূমিকম্প,আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত এবং পাহাড়ের পাদদেশের নদী ও সাগরের ঢেউ থেকেও পাহাড় ধস হতে পারে।আর মনুষ্য সৃষ্ট কারণ হিসেবে গবেষণায় বলা হয়েছে,পাহাড়ের গাছ পালা কেটে ফেলা, মাটি কেটে ফেলা,পাহাড়ে প্রাকৃতিক খাল বা ঝর্ণার গতি পরিবর্তন,পাহাড়ের ঢালুতে অতিরিক্ত ভার দেওয়া এবং খনি খননের কারণে পাহাড় ধস হতে পারে।তবে আমাদের ভূতাত্ত্বিকরা বলছেন,বাংলাদেশে মূলত পাহাড়ের উপরের দিকে কঠিন শিলার অভাব,পাহাড়ের মাটি কেটে ফেলা এবং বড় গাছপালা কেটে ফেলার কারণেই পাহাড় ধস হয়ে থাকে।বাংলাদেশের পাহাড়গুলোতে কোন কঠিন শিলা নেই।তাই বৃষ্টির কারণে এ ধরনের মাটি পানি শুষে ফুলতে থাকে।তাছাড়া কঠিন শিলা না থাকায় মাটিগুলো নরম ও পিচ্ছিল হয়ে যায়।ফলে ভারি বর্ষণের সাথে সাথে মাটি ভেঙ্গে পড়ে।তাছাড়া যারা পাহাড়ে থাকেন তারা ঘর নির্মাণের জন্য পাহাড়ের সবচেয়ে শক্ত মাটির স্তরও কেটে ফেলেন।এতে পাহাড় ধ্বসের শঙ্কা আরও তীব্র হয়।কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, পাহাড় ধসে গত ১০ বছরে ৬ সেনা সদস্যসহ ৩ শতাধিক মানুষের প্রাণহানি হয়েছে।২০১১-২০১৩ সালে পাহাড় ধসে মৃত্যু হয়েছে ১৯ জন,২০১৫ সালে কক্সবাজার শহরের রাডারের পাহাড় ধসে মা-মেয়েসহ ৫ জন এবং সর্বশেষ ২০১৬ সালে পাহাড় ধসে মারা যায় ১৭ জন মারা যায়।
দেশে এখনও পর্যন্ত ভয়াবহ পাহাড় ধসগুলো ঘটেছে ২০০০ সালের পরে।২০০৮ সালে বান্দরবান শহরের বালুচরা এলাকায় পাহাড় ধসে ১৩০ জনের প্রাণহানি ঘটে। পাহাড় ধসের সবচেয়ে মর্মান্তিক ঘটনাটি ঘটে ২০০৭ সালের ১১ জুন।সেদিনের টানা বর্ষণে বন্দরনগরী চট্টগ্রামের হাটহাজারী,পাহাড়তলি,বায়েজীদ বোস্তামি, খুলশী এলাকায় পাহাড় ধসে ১২৭ জন নিহত এবং দুই শতাধিক মানুষ আহত হন।২০০৯ সালের ৬ মে বান্দরবানের গ্যালেঙ্গা এলাকায় প্রায় ৭০০ ফুট উঁচু পাহাড় ধসে সাঙ্গু নদীতে পড়ে যায়।এ দুর্ঘটনায় কোনও প্রাণহানি না ঘটলেও ২৫ ফুট প্রশস্ত সাঙ্গু নদীর অন্তত ১০ ফুটজুড়ে উঁচু বাঁধের সৃষ্টি হয় এবং নৌযান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়।২০০৯ সালের ১৮ মে মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গলের কালিঘাটি উপজেলার চা-বাগানসংলগ্ন পাহাড় বৃষ্টি ও ঝড়ো হাওয়ার তোড়ে ধসে পড়ে। ফলে একই পরিবারের ৫ জনসহ মোট ৬ জন ঘটনাস্থলেই মৃত্যুবরণ করেন।পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের (পবা) সাধারণ সম্পাদক প্রকৌশলী মো.আবদুস সোবহান বলেছেন,অবৈধভাবে দখল করে গাছ কেটে নেওয়ার কারণেই পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটেছে।পাহাড় প্রাকৃতিক সৃষ্টি। পাহাড়ের মাটি এবং গাছ কেটে বিক্রি করার কারণে সেখানকার স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে।বছরের পর বছর ধরে এভাবে পরিবেশ নষ্ট করার কারণেই পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটেছে।’ তিনি বলেন, ‘সরকার তো সিদ্ধান্ত নেয় পাহাড়কে বাঁচানোর জন্য।কিন্তু সরকার দলের নেতাকর্মীদের কারণেই তা বাস্তবায়ন হয় না।রাজনৈতিক ছত্র-ছায়ায় থাকা ব্যক্তিরাই এ ধরনের কাজ করে থাকেন।(((মিয়া হোসেন;দৈনিক সংগ্রাম)))